ভয় কিসে চীনের? - Natore News | নাটোর নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ | বিনোদন খবর

Post Top Ad

Responsive Ads Here


লি ওয়েনলিয়াংয়ের কথা মনে আছে? চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের একটি হাসপাতালের চক্ষুরোগের চিকিৎসক ছিলেন ৩৪ বছর বয়সী লি। সবার ভালো চেয়েছিলেন তিনি। তাই আগপিছ না ভেবে একদম শুরুতেই করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রথম সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা শোনা তো দূরের কথা, উল্টো তাঁকে ‘গুজব রটনাকারী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। হেনস্তার পর আচ্ছা করে শাসিয়ে তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। লির সতর্কবার্তা যে গুজব ছিল না, তা প্রমাণিত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। প্রাণঘাতী করোনা হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি শেষমেশ এই চিকিৎসকের মৃত্যু হয় সেই করোনাতেই।

সবশেষ করোনার উৎস তদন্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশেষজ্ঞ দলকে চীন তার দেশে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনায় চিকিৎসক লি ও তাঁর পরিণতির কথা মনে পড়ল। আসলে করোনা নিয়ে শুরু থেকেই চীনের লুকোচুরি স্পষ্ট।

প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন দেশ ও বিশেষজ্ঞরা বারবার করোনার উৎস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এই আহ্বানকে কখনোই ভালোভাবে নেয়নি চীন। বরং যে বা যারা আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়েছে, তারাই বেইজিংয়ের আক্রমণের শিকার হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে শত্রুর কাতারে ফেলেছে চীন।

বিশেষ করে ডব্লিউএইচও করোনার উৎস অনুসন্ধানে একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলকে উহানে পাঠাতে মাসের পর মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সব সময়ই চীনের অনাগ্রহ লক্ষ করা গেছে। অনেক দেনদরবারের পর গত মাসে ডব্লিউএইচও বেইজিংয়ের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তারা বেশ ঘটা করে ঘোষণা দেয়, বিভিন্ন দেশের ১০ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্তদল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে উহান যাবে। তখন চীনও প্রকাশ্যে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ডব্লিউএইচওর এই উদ্যোগ একটা হোঁচট খেল। তদন্তদলকে চীনে যাওয়ার জন্য অনুমতিই দেয়নি চীন। ফলে তারা সময়মতো চীনে যেতে পারছে না।

চীনের এমন আচরণে ডব্লিউএইচও প্রকাশ্যে হতাশার কথা জানিয়েছে। ডব্লিউএইচওর এমন ‘বিরল’ প্রতিক্রিয়ার জবাবে চীন বলছে, তদন্তদলের সদস্যদের উহানে যাওয়ার জন্য যথাসময়ে অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ হয়েছে। এ যাত্রায় চীন ‘ভুল-বোঝাবুঝির’ অজুহাত দিলেও তারা ঠিক কবে তদন্তদলকে তার দেশে প্রবেশের অনুমতি দেবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।

ডব্লিউএইচওর তদন্তদলকে চীন যেতে অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা করোনা ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান নিয়ে থাকা পুরোনো সন্দেহকেই জোরালো করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তবে কি বেইজিং এই তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে?

২০১৯ সালের শেষ দিকে উহানে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। পরে তা পুরো চীন, চীন থেকে সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে বিশ্বের ৮ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। ১৮ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা। ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় করোনার একাধিক টিকা এসে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, উৎপত্তির পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে এখনো গভীর ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীনের গবেষণাগার থেকে করোনা ছড়িয়েছে। তবে চীন এই অভিযোগ দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক তদন্তের ব্যাপারেও আন্তরিক নয়। অন্তত এ পর্যন্ত তাদের কার্যক্রমে সেটাই প্রতীয়মান হয়।

ডব্লিউএইচওর তদন্তদল স্পষ্ট করে বলেছে, কোনো অপরাধী দেশ বা কর্তৃপক্ষকে খুঁজে বের করা তাদের মিশন নয়। বিজ্ঞানের ভিত্তিতে, বিশেষ করে তারা খতিয়ে দেখবে ভাইরাসটি ঠিক কীভাবে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হলো।

তদন্তদলের থাকা জার্মানির বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান লিয়েনদার্জ বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন মহামারির পুনরাবৃত্তি এড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি হ্রাসের জন্য ঠিক কী ঘটেছিল, তা বোঝাটা জরুরি।

চীন ডব্লিউএইচওর তদন্তদলটিকে উহান যাওয়ার অনুমতি দিলেও তারা তাদের উদ্দেশ্য অর্জনে কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই সন্দেহের কথা তুলে বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচওর তদন্তদলটি চীনে রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে তদন্তদলের চীনা কর্মকর্তাদের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

করোনার উৎস, প্রাথমিক সাড়া, বিস্তার, মোকাবিলা, ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বেইজিংয়ের ভাষ্য ও প্রকৃত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল থাকার নানা প্রমাণ ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে করোনার উৎপত্তিকাল থেকেই উহান ও বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষের তথ্য গোপন, অবহেলার মতো বিষয় উঠে এসেছে।

চীনে করোনা নিয়ে সত্য কথা বলে অনেকেই শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। এ অবস্থায় করোনার শুরুর দিকের তথ্য পেতে উহানের প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ ডব্লিউএইচওর তদন্তদল পাবে কি না, কিংবা পেলেও তাঁরা সত্য বলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

গত মাসের শুরুতে ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ডব্লিউএইচওর তদন্তদলকে সতর্ক করে বলা হয়, করোনার উৎস তদন্তের ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা আশা করা ঠিক হবে না।

করোনাই শেষ মহামারি নয়। করোনার চেয়ে আরও বড়, আরও ভয়ংকর মহামারি ভবিষ্যতে পৃথিবীতে হানা দিতে পারে বলে ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে। ফলে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে করোনার উৎস ও মানবদেহে তার ঢুকে পড়ার ইতিবৃত্ত জানা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞদের মত। কিন্তু এ জন্য দরকার চীনের আন্তরিক সহযোগিতা। করোনার উৎস নিয়ে চীন যদি তার দাবি অনুযায়ী সৎ আর স্বচ্ছই থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক তদন্তের ব্যাপারে বেইজিংয়ের এত ভয় কিসে!

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here