ব্যবহারিক শিক্ষাই যেখানে প্রথম - Natore News | নাটোর নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ | বিনোদন খবর

Post Top Ad

Responsive Ads Here
ব্যবহারিক শিক্ষাই যেখানে প্রথম

ব্যবহারিক শিক্ষাই যেখানে প্রথম

Share This

দূর থেকে লাল ইটে মোড়া ভবনটি দেখে পুরোনো দিনের কোনো দুর্গ মনে হতে পারে। নামটাও অবশ্য দূর থেকেই চোখে পড়ল। বড় করে লেখা আছে—ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি। মূল ফটক পেরিয়েই সিন্দবাদের সাজে সজ্জিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শুধু সিন্দবাদই নয়, রূপকথার নাম না-জানা আরও অনেক চরিত্রের ভিড় ঠেলে সামনে এগোলাম। জানা গেল, বিকেলে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ-বিষয়ক নাটকের আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরমিং আর্টস ক্লাব। কস্টিউম পরে চলছিল মহড়া। অভিনয়শিল্পীরা কেউ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছেন, কেউ-বা ব্যবসা শিক্ষায়। শখের বশে অভিনয় করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি এই সৃজনশীলতার চর্চা চোখে পড়বে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির (ইডব্লিউইউ) প্রাঙ্গণজুড়ে। এখানকার পাঠ্যক্রমও এমনভাবে সাজানো হয়, যেন শুধু ক্লাস, পরীক্ষা বা অ্যাসাইনমেন্টের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দুনিয়াটা আটকে না যায়। কেমন চলছে পড়াশোনা? জানতে অনুমতি নিয়ে ঢুকে পড়লাম একটা ক্লাসে। আর্টিফিশিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিগ ডেটা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কঠিন কঠিন শব্দ শুনে ভাবছিলাম, প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে। কিছুক্ষণ পর ভুল ভাঙল। জানলাম, এটা ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস। কীভাবে প্রযুক্তি আর ব্যবসার মধ্যে সংশ্লিষ্টতা তৈরি করা যায়, সেটাই পড়াচ্ছিলেন শিক্ষক। ক্লাস শেষে তাসমান ফারাবি নামে এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘আমাদের সব ক্লাসই এমন। হুট করে কেউ ক্লাসে চলে এলে দ্বিধায় পড়ে যাবে। এখন যেমন আমরা শিখছি কীভাবে প্রযুক্তি আর ব্যবসাকে এক করে উদ্ভাবনী কিছু করা যায়, একটু পর শিখব ব্যবসায়িক বিতর্কের কলাকৌশল।’ পাশ থেকে আলাপে যোগ দিলেন পায়েল বসাক নামের আরেকজন। বললেন, ‘আমি পড়াশোনা শেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিতে যোগ দিতে চাই। এখনকার দুনিয়া এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে ভবিষ্যতে কী হবে তা বলা মুশকিল। শিক্ষকেরা আমাদের আগামীর পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে চেষ্টা করছেন।’ ইডব্লিউইউ ঘুরে পায়েলের বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া গেল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণার চেষ্টা চলছে ফার্মাসি, জেনেটিক প্রকৌশল, কম্পিউটার প্রকৌশলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণাগারে। লালরঙা ক্যাম্পাসটাতে আমাদের ‘গাইড’ হিসেবে কাজ করছিলেন বিবিএর ছাত্র জোবায়ের মাহমুদ। তাঁর দিনের অর্ধেক ব্যস্ততা থাকে ক্লাসের বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট আর কুইজ ঘিরে। বাকি সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ক্লাবের কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ। জোবায়ের জানালেন, ইস্ট ওয়েস্টের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ক্লাবের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ছাত্রছাত্রীদের ২৬টি সংগঠনের আয়োজনে সারা বছর সরব থাকে রাজধানীর আফতাবনগরে অবস্থিত এই ক্যাম্পাস। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, শিল্পকলা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসা ও অর্থনীতি—তিন ফ্যাকাল্টির অধীনে সব বিষয়ে হাতে-কলমে ব্যবহারিক শিক্ষাকে উৎসাহ দেওয়া হয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। বর্তমানে সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন ২৫০ জনের বেশি শিক্ষক। উপাচার্য এম এম শহিদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের বড় শক্তি হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী মনন। কোনো ক্লাসেই আমরা ৩৫ জনের বেশি ছাত্র ভর্তি করি না। বিভিন্ন ল্যাবও এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী হাতে-কলমে প্রতিটি বিষয় শেখার সুযোগ পায়।’ জানা গেল, বাংলাদেশের আনাচকানাচ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যেন এখানে পড়ার সুযোগ পান সে জন্য প্রতিবছর ৬ কোটি টাকার বেশি বৃত্তি প্রদান করা হয়। ক্যাম্পাসের মাঝখানের খোলা জায়গাটাকে শিক্ষার্থীরা বলেন ‘গ্রাউন্ড’। ছেলেমেয়েদের কোলাহলে এই এলাকা মুখর থাকে সারা দিন। সব রং এসে মেশে এখানেই। ক্যাম্পাসের আড্ডা-গল্প-গানের হেঁশেল বলা যায়। গ্রাউন্ড পেরিয়ে আমরা এগোলাম পাঠাগারের দিকে। দেখা হলো আবদুল কাদের ও অরিশনা মমতাজের সঙ্গে। পাঠাগারের আদবকেতা বজায় রেখে দুজন নিচু গলায় জানালেন, সামনে পরীক্ষা, তাই আড্ডা-গল্প বাদ দিয়ে পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের আর বিরক্ত না করে আমরা পা বাড়ালাম। ফেরার পথে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরমিং আর্টস ক্লাবের কর্মীদের সঙ্গে দেখা। একটু পরেই তাঁদের নাটক শুরু হবে। কথা বলার ফুরসত নেই। ঢোকার সময়ই নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁরা। এদিকে আমাদের বিদায়ের সময় হয়েছে। সিন্দবাদ আর অন্য চরিত্রগুলোকে মঞ্চে দেখা হলো না বলে আফসোস থেকে গেল...আমাদের দেশের নবীন শিক্ষার্থীরা যেন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, ২১ বছর ধরে আমরা সেই চেষ্টাই করছি। সামনে বাংলাদেশের শিল্প খাত বিকশিত হবে। এই দিকটির কথা বিবেচনা করে আমরা উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষাপদ্ধতিতে আধুনিক পরিবর্তন এনেছি। শিল্প খাতমুখী ও বাস্তব গবেষণার প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেন আগ্রহী হয়, আমরা সে রকম পরিবেশ গড়ে তুলেছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, তখন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে সার্থক মনে হয়।’

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here